বেদ-বেদান্ত, মহাকাব্য - গোবিন্দ মোদক*
ভারতীয় সাহিত্যে বেদ-ই হলো প্রাচীন নিদর্শন
অপৌরুষেয় – নৈব্যক্তিক — বলেন প্রাজ্ঞজন।
সনাতন ধর্মের সর্বপ্রাচীন গ্রন্থ হয় এই “বেদ”
স্বয়ং ব্রহ্মা-সৃষ্ট জ্ঞান — না মানলেও নেই খেদ।
ঋক, সাম, যজু, অথর্ব — এই চারি বেদ হয়,
“বেদ” শব্দটির অর্থ “জ্ঞান” — শুনুন মহাশয়।
সংহিতা ব্রাহ্মণ আরণ্যক উপনিষদ বেদের চার ভাগ
তন্নিষ্ঠ পাঠক মাত্রেরই এতে জন্মে অনুরাগ।
উপনিষদ হলো বেদান্ত যা বেদের শেষ অধ্যায়,
শাস্ত্রে একশো আট উপনিষদের দেখা পাওয়া যায়।
উপনিষদ শব্দের অর্থ — “ব্রহ্মাবিদ্যা” জেনো,
গুরুর সঙ্গে একত্রে আলোচনা এ কথাটা মেনো।
সৃষ্টি থেকে প্রলয় পর্যন্ত ব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস
আঠারো পুরাণ জুড়ে তাহা সবই আছে ন্যাস।
হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্য আখ্যান
সৃষ্টি-তত্ত্ব, ভূগোল-তত্ত্ব — সব পুরাণেরই দান।
মূলতঃ বীর রসাত্মক আখ্যানকাব্য মহাকাব্য হয়
জাত মহাকাব্য ও সাহিত্য মহাকাব্য- এই পরিচয়।
রামায়ণ মহাভারত সংস্কৃত সাহিত্যে দুই মহাকাব্য
গ্রীস দেশের ইলিয়াস, ওডিসি খুবই সুখশ্রাব্য।
সাহিত্যিক মহাকাব্য আবার ভিন্ন প্রকার হন
যেমন “প্যারাডাইস লস্ট” লিখেছেন মিলটন।
মাইকেল মধুসূদনের “মেঘনাদবধ” মহাকাব্য
একবার পড়ে দেখতে পারেন খুবই সুখশ্রাব্য।
হে বাসুদেব! তোমাকে প্রণাম!" - নীলাঞ্জনা ভৌমিক
শরৎকালের মাঝামাঝি কার্তিক মাসে ব্রজবাসিগন বজ্র ও বিদ্যুতের দেবতা স্বর্গরাজ্যের অধিপতি ইন্দ্রের পূজার আয়োজন করে থাকেন। এই প্রথা অনুযায়ী বৃন্দাবন ও বরসানাবাসীগন ইন্দ্রপূজার আয়োজন করে গোবর্ধন পর্বতের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।এই পূজার পৌরোহিত্য করেন আয়ন ঘোষের পিতা ও জটিলার স্বামী উগ্রপথ।উগ্রপথ ইন্দ্রের অন্ধভক্ত ছিলেন। তিনি ইন্দ্রকে শুধুমাত্র ভক্তি সহকারে পূজা করতেন তা নয়,ভয়ও পেতেন।বৃন্দাবনবাসী ও বরসানাবাসী পূজা উপাচার সাজিয়ে নিয়ে গোবর্ধন পর্বতে উপস্থিত হন ইন্দ্রের পূজার উদ্দেশ্যে । উগ্রপথ ইন্দ্রকে সন্তুষ্ট করার জন্যে এক ছাগশিশু বলী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শ্রীকৃষ্ণ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।তিনি নিরীহ নির্দোষ প্রাণীর বলীর বিরোধী ছিলেন ।তিনি এই বলীদানে বাঁধা দিতে গেলে পুরোহিত উগ্রপথ অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন তখন শ্রীকৃষ্ণ পূজায় অংশ গ্রহণ-কারীদের উদ্দেশ্যে বলেন ---------
- " দেবতা প্রাণীকে রক্ষা করেন কিন্তু এ কেমন দেবতা যে এক নিরীহ নির্দোষ পশুর বলীতে খুশী হন! ভক্তির আধার প্রেম ,ভয় নয়। প্রেম দিয়ে দুঃখ ভাগ করে নেওয়া যায় কিন্তু কারুর ব্যক্তিগত দূঃখকে দূর করার জন্য কাউকে হত্যা করা উচিত নয়। ভক্তির আধার যদি ভয় হয় সেখানে ভক্তি বাস করে না আর যে দেবতাকে প্রসন্ন করতে কোন নির্দোষ প্রাণীর প্রাণ যায় সে দেবতা প্রসন্ন করার যোগ্য নয়। ভগবান কে ? - দাতা , যিনি দান করেন কিন্তু যিনি জীবন দেওয়ার জায়গায় প্রাণ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন,যাঁর দাবীর কারণে ভক্তের ধর্ম ও কর্মের শুদ্ধতা নষ্ট হয় এমন দেবতাকে পূজা না করে তাকে ত্যাগ করাই উচিত।
এখানে উপস্থিত যত মাতা আছেন তাদের কাছে আমার একটাই প্রশ্ন যদি কোন মাতার সামনে তার সন্তানকে বলী দেওয়া হয় তবে সেই মাতার অন্তরের কি অবস্থা হয় ? এখানে আমরা সবাই বেঁচে থাকতেই এসেছি, জীবন ধারন করার ইচ্ছা সবার আছে তবে কার অধিকার আছে এই দুগ্ধ পোষ্য ছাগশিশুর জীবন ছিনিয়ে নেওয়ার ? কে আমাদের অধিকার দিয়েছে এক মাতার থেকে তার নিরীহ শিশুটিকে ছিনিয়ে নেওয়ার? এখনও কি আপনারা মনে করেন এই নির্দোষ প্রাণীর বলি দেওয়া কি উচিত ? " শ্রীকৃষ্ণের এই কথায় উক্ত স্থানে উপস্থিত সব পূজারীগণ সহমত পোষণ করেন। এরপর তিনি আহ্বান জানান,
" আপনিও এই পক্ষে আসুন উগ্রপথকাকা ! ত্যাগ করুণ এমন দেবতাকে যিনি আপনাকে দিয়ে এত পাপ করিয়েছেন ?"
" আমার পূর্বজ আরাধ্য কে ত্যাগ করবো ? তবে কাকে আমার আরাধ্য মানবো ? কার পূজা করবো আমি ?"
তখন শ্রীকৃষ্ণ বলেন, " এই গোবর্ধন পর্বতকে ? এই পর্বত আমাদের ছায়া দিয়েছে, শুদ্ধ বায়ু , জল দিয়েছে, পশু চরানোর স্থান দিয়েছে --- মানুষের সুবিধার্থে কি দেয় নি সে ? যার কারণে আমরা দুধ,ঘী,মাখন আরও কতো খাদ্যের স্বাদ গ্রহণ করতে পারছি ,যার কারণে আমরা অন্ন প্রাপ্ত হই,এর কিছু সময় পরেই বর্ষা নামবে তবে ইন্দ্রকে পূজা করার কি প্রয়োজন ? বর্ষা করানো ইন্দ্রের ধর্ম, বলী হোক বা নাই হোক।আপনি যে পূর্বজর কথা বলছেন তিনি নিজেও এই গোবর্ধন পর্বতের অন্ন,জল গ্রহণ করেছেন? তথাপি এর পূজার কি প্রয়োজন আর এই
রকম পূজা যে পূজায় বলি দিতে হয়!
" পর্বত ভগবান নয়, ওর পূজা হয় না ? ওর প্রসাদ গ্রহণ করে না "
" যদি মনে শুদ্ধতা থাকে তো কোন কিছুই অসম্ভব নয়। যদি পর্বত প্রসাদ গ্রহণ করে তবে ?"
" যদি এই পর্বত প্রসাদ গ্রহণ করে তবে আমি পশুর ই ভুলে যাবো। আর প্রসাদ গ্রহণ যদি না করে তবে পশুবলী থেকে আমাকে কেউ আটকাতে পারবেনা!"
" যা আপনার ইচ্ছা "
" পাথর কখনো ভগবান হয় না!! "
পুরোহিত উগ্রপথ ও শ্রীকৃষ্ণের এই কথোপকথনের পর উপস্থিত সকল পূজারীগণ শ্রীকৃষ্ণের পক্ষ অবলম্বন করেন এবং সবাই অনুরোধ করেন -
" দেখো কৃষ্ণ এই নিরীহ প্রাণীগুলোর যেন প্রাণ না যায় "
তখন শ্রীকৃষ্ণ সবাইকে আত্মস্থ করে বলেন যে
" যাকে তুমি শুদ্ধ প্রেম করো তার উপর ভরসা আছে তো ? পরে মনে হবে না তো সে তোমাকে প্রেম করে না ?"
" না কখনো না "
" যার উপর তোমাদের অকুন্ঠ বিশ্বাস আছে,অনন্ত প্রেম আছে দেখ তা যেন কখনো হারিয়ে বা ভেঙ্গে না যায় " । অন্ধ শ্রদ্ধার নিবৃত্ত করে প্রকৃত প্রেম স্থাপন করাই ধর্ম।"
গোবর্ধন পর্বতে বৃন্দাবন ও বরসানাবাসীগন কর্তৃক নিবেদিত প্রসাদ স্বয়ং নারায়ণ গ্রহণ করেন।
এই ঘটনা থেকে প্রকৃত ভগবত্ প্রেমের এক বাস্তব সম্মত বোধ উপলব্ধি হয় যে প্রকৃত ভক্তির আধারই হচ্ছে প্রেম। যে পূজায় প্রকৃত প্রেম নেই ভক্তি নেই সেই পূজার কোন অর্থ নেই।
শ্রীকৃষ্ণ ও কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একই চিন্তাধারার পথিক ছিলেন ---
সংসার যবে মন কেড়ে লয়, জাগে না যখন প্রাণ,
তখনও,হে নাথ,প্রণমী তোমায় গাহি বসে তব গান।
অন্তরযামী ক্ষমা সে আমার শূণ্য মনের বৃথা উপহার-
পুষ্পবিহীণ পূজা- আয়োজন ভক্তিবিহীন তান।।
ডাকি তব নাম শুষ্ক কন্ঠে আশাকরি প্রাণপণে -
নিবিড় প্রেমের সহসা বরষা যদি নেমে আসে প্রাণে।
সহসা একদা আপনা হইতে ভরি দিবে তুমি তোমার অমৃতে
এই ভরসায় করি পদতলে শূণ্য হৃদয় দান।।
আমি দ্রৌপদী - সুমিতা চৌধুরী
আমি দ্রুপদ রাজার কন্যা দ্রৌপদী,
আমি এক অনন্যা সুন্দরী,
সবার মুখে শুনি, আমার মতো সুন্দরী নেই কোনো নারী।
তবু কেন বলতে পারো,
আমার প্রেম বারংবার আমায় ছেড়ে বহুগামী?
আমি যাজ্ঞসেনী,
যজ্ঞের আগুনে জন্ম আমার,
তাই বুঝি এতো তেজস্বীনী, প্রতিবাদীনী, স্পষ্টবাদিনী।
কিন্তু, যবে আমার প্রেমিক পুরুষ স্বয়ম্বরসভায় লক্ষ্যভেদে জয় করলো আমায়,
বরণ করার আগেই শ্বশ্রুমাতা বাঁটলো যখন তাঁর সকল পুত্রের ভিতর,
তখন কই প্রতিবাদ করলাম আমি?
কোথায় হারালাম নিজের সেই তেজস্বীতা রূপ?
কোথায় হারালাম আপন স্পষ্টবাদি স্বরের কাঠিন্য?
হয়ে গেলাম পরবশতার স্বীকার সেই ক্ষণ থেকে আজীবনের!
সবাই বলে আমায় অসহিষ্ণু, তেজস্বীনী,
যেদিন দ্যুতক্রীড়ার ভরা সভায় হচ্ছিল আমার নারীত্বের চরমতম অপমান,
সেদিন আমার থেকে সহ্যশক্তি ধারণ করতে পেরেছিল কি এ ধরিত্রী মাও?
সবাই বলে আমায় এই অখণ্ড ভারতভূমির সম্রাজ্ঞী,
সম্রাট যুধিষ্ঠিরের পার্শ্বে উপবেশন করেছিলাম রাজসূয় যজ্ঞে।
কিন্তু আমার মনের খবর কে রাখে?
হতে চাইনি আমি সম্রাজ্ঞী,
হতে চেয়েছিলাম আমি শুধুই তৃতীয় পাণ্ডবের প্রেয়সী, এক সুখী ঘরণী।
যে রাজা নিজেই আপনাকে রক্ষার ক্ষমতাধিকারী নন,
যে রাজা সামান্য দ্যুতক্রীড়ার পরবশ পদানত হয়ে আপন সমগ্র রাজত্ব হারিয়ে হন কপর্দকহীন,
তারপরও তাঁর নেশার অনল বাঁধ মানে না,
একে একে বাজি রাখেন আপন ভাইদেরও,
এবং সর্বোপরি আপন স্ত্রীয়ের মান-মর্যাদার কথা সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হয়ে আমাকেও করেন সেই দ্যুতক্রীড়ায় সামিল, বাজির বোড়ে করে,
তাঁর গর্বে অহঙ্কারী হওয়ার সত্যিই কি কিছু রয় অবশিষ্ট?
আমার নাকি পঞ্চস্বামী,
তাই বহুপতিত্বে স্মরণ করা হয় আমায় আজও!
কেউ কি জানতে চেয়েছে কখনো,
একটি নারীর এমন জীবন আদৌ তার কাঙ্খিত কিনা?
কি বিভীষিকাময় হয় তার এই নরক জীবন।
যে প্রতিমাসে এক এক জনের শুধুই ভোগ্যা,
তার ভালো- মন্দ, সুখ- অসুখের নেই কোনো দাম কারো কাছেই!
আমি ধর্মপরায়ণা,
হায়রে ধর্ম, সে তো আমার প্রতি পদের শৃঙ্খল শুধুই।
যা আষ্টেপৃষ্টে করেছে আমায় চিরবন্দিনী, আমারই অবাঞ্ছিত জীবনে।
আমাকে ভোগের লালসায় মত্ত হয়ে হয়েছিল সেই বিধ্বংসী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ,
সবাই বলে, আমার প্রতিশোধের অনলে ছারখার হয়েছিল কৌরবকূল।
সত্যিই কি তাই?
বলো সখা কৃষ্ণ, বারেক সত্যবাণী।
সবাই আমাকে শিখণ্ডী করে খেলে নি কি দাবা,
আপন আপন স্বার্থ চরিতার্থে?
তাই তো শূণ্য হলো আমার কোল,
উজাড় হলাম আমি, আপন পঞ্চপুত্র শোকে।
তবুও ছত্রিশ বছর করতে হলো আমায় এ ধরায় বাস,
রিক্ত শূন্য হয়েও সম্রাজ্ঞী রূপে!
আমার সতীত্বের করা হয় বড়াই,
লোকে করে ধন্য ধন্য।
হে পুরুষ সমাজ, আর কতোদিন দ্রৌপদীর আড়ালে সব নারীকেই করবে তোমাদের ভোগের সামগ্রী?
তাদের শিখণ্ডী করে সাজাবে আপন স্বার্থের পাশার দান?
তাই তো, মহাপ্রস্থানের পথে রইলাম পড়ে আমি একাকী, হিমালয়ের কোলে চরম অবহেলে।
আমার প্রিয়ও ক্ষণিকের তরে থামলো না, চাইলো না ফিরে,
আমি দ্রৌপদী, চির অসহায়, চির অভাগীনী, এক নারীর প্রতিমূর্তি।।
মহাকাব্য মহাভারত - শ্রী প্রশান্ত কুমার সরকার
পুরাণ কভু নয়তো রূপক
নয়তো শুধু গল্প গাথা,
পুরাণ বাঁধা আছে ইতিহাস
পুরাণ শেখায় জীবন কথা।
মহাভারত শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য
অধর্ম ছেড়ে ধর্ম শেখায়,
থাকুকনা অধর্মের বল বৈভব
ধর্মের সদা হবেই জয়।
শাসক প্রধান অন্ধ স্নেহে
যুররাজ লিপ্ত লোভ লালসায়,
বিবেক "কৃষ্ণ" হোতা "অর্জুনে"
অধর্ম বিনাশে পথ দেখায়।
মহাভারত তো মানব দেহ
অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র করছে রাজ,
মন যুবরাজ অধর্মে ডুবে
কৌরব শাসনে চলছে সমাজ।
বিবেকে যদি কৃষ্ণ বিরাজে
মন অর্জুন সঠিক পথে,
লালসা কৌরব হবেই ধ্বংশ
আনন্দ জীবন ধর্মের রথে।
ওরা - সুশান্ত সেন
ওরা পাল্টাতে চেয়েছিল
ওরা চেয়েছিল বাতাস বিষ মুক্ত করতে
তারপর নিশান ওড়াতে
ওরা যেতে যেতে পথে দেখেছিল
চোখ রাঙানি
দেখেছিল রাস্তায় হায়না, ক্ষুধার্থ হায়না
দন্ডায়মান।
আর কাঁটাতারে ঘেরা আকাশটা নিয়ে
ওরা চোর পুলিশ খেলছিল।
এদিকে শব্দগুলো কখন উত্তাল হয়ে
সমুদ্রের ঢেউ হয়ে যাবে , ওরা বোঝেনি।
তাই ম্রিয়মাণ ওরা সারি সারি
বসে আছে ছাউনীর ভেতরে
হিংস্র শ্বাপদ রা রাত্রি হয়ে
ওদের ছিঁড়ে ফেলার জন্য
গজরাচ্ছে।
