কান্না রাগের "হোমা পাখি"
ঝোড়ো আষাঢ়ের নীহারিকাঘন আকাশটাকে পেছনে ফেলে, জরাজীর্ণ রেললাইনটাকে মহাজাগতিক ভালোবাসার টানে বুকে জড়িয়ে, কোনো এক নাতিদীর্ঘ্য ম্রিয়মাণ বিকেলে হাট বসেছিল, নবদ্বীপ হাটের এই ছোট্ট জনপদটায়| পূর্ববঙ্গ থেকে ভেসে আসা ছিন্নমূল প্লবতার চিহ্ন গায়ে এঁকে, প্রতিবিম্বের আস্যে বিপরীতগামী চঞ্চল জীবন খুঁজে চলে জায়গাটা| আজ শনিবার রেললাইন দিয়ে মালগাড়ি যাবে না| ইয়ার্ড ঘেঁষে তাই ছোটোখাটো নামগোত্রহীন হকারের রাজত্ব চলে| রেলপুলিশের আনাগোনা আজ এদিকটায় কমই থাকে| আরও অনেক আগে এখানে খেলনা ট্রেন চলতো, অনেকটা পাহাড়দেশের গা বেয়ে চলা ছোট্ট রেলগাড়ির মতো| হারু ছোট থাকতে দেখেছে| তখন লাইনও ছোট ছিল ওর মতো| এখন হারুর বয়স চোদ্দ| ঘটনাটা বছর পাঁচ ছয়েক আগের| আকাশফাটা ঘড়ঘড় শব্দে রেলের লোকেরা দুটো খেলনা বগিকে জোড়া লাগাত, হারু আর ওর বয়সী কটা ছেলে ভিড় করে সেসব দেখত, তখনও হারুর মা বেঁচেছিল| ওর বাপটা তখন ওই খেলনা ট্রেনেই হকারি করতো| বেশ ভিড় হতো তখন ট্রেনগুলোতে| লোকজন গেট থেকে ঝুলে ঝুলে যাতায়াত করতো| হারুরা দল বেঁধে ট্রেনের কামরার ছাতে চড়ে বসত| ট্রেনে চড়েই ওদের দিন কাটত| ঘরে কতদিন ওর মা বসে থাকতো ভাতের থালা নিয়ে|
বছর দুয়েক হল একটা অজানা অসুখে হারুর মা মারা গেছে, শেষ দিকে খালি মুখ দিয়ে রক্ত উঠত, ওর বাপ বলেছিল "ক্যান্সার"| মা টা মারা যাবার পর থেকেই ইস্কুল ছেড়ে গেল হারুর, খেলনা ট্রেনও এখন আর নেই| ও আর ওর বাপ মিলে এখন হকারি করে, সপ্তাহে একদিন এখানটায় বসে, মেয়েদের সায়া-ব্লাউজ, ছেলেদের গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া, বারমুডা এইসব নিয়ে ওর বাপটা হাঁক পাড়ে, "হরেক মাল তিরিশ টাকা, বিশুইদ্ধ মাল তিরিশ টাকা,লইয়া যান বৌদি, ও দাদা!", সঙ্গে হারু সামলায় চারদিক|
সেদিন হারুটা একটু অন্যমনস্ক ছিল, কি জানি কি ভাবছিল, ওর বাপটা ধমক দিয়ে থাবড়ায় ওর গালে "মারইনের পো, কি দ্যাখস? মাগী?” হঠাৎ প্রচন্ড শব্দ করে মালগাড়ি ঢুকতে থাকে লাইনে, রেরে করে তেড়ে আসে রেলপুলিশ, সবার দোকানের জিনিস আছড়ে ফেলতে থাকে| পড়ি কি মরি করে দৌড় দেয় হারু, বাপের দিকে, জিনিসগুলোর দিকে তাকানোর আর সময় পায় না| ছুটতে ছুটতে মাঠ পেরিয়ে, কাঁচা পাকা টিনের চালের বাড়িগুলো পেরিয়ে, ঢোকে শাকারী পাড়ার গলিতে| ও জানে এটা “মাগী পাড়া”, চট করে এদিকটায় আসে না ও| দূরে দাঁড়ানো মেয়েটা, পড়নে টাইট ফিটিং ব্লাউজ আর সেমিজ হাঁটু অবধি তোলা, মুখে রং মেখে ওকে দেখে চোখ টেঁপে, দাঁতে ঠোঁট কামড়ে ইশারায় ওকে ডাকে, সে চোখে তখন কাঙালিনীর শরীর নেঙড়ানো হিসেবি আগুন জ্বলে| পশ্চিমের আকাশে তখন কামুক যৌনতা, আকাশের সাথে মৌসুমীর নিগূঢ় আঁতাত| হারু চোখ বোজে| ওকি ওঁর মাকে খোঁজে?
শিশু শ্রমিক - অভিজিৎ দত্ত
শিশু শ্রমিক এক অমানবিক প্রথা
কচি বয়সে পড়াশোনার বদলে
মাথায় তাদের একরাশ কাজের বোঝা।
শিশুরা যদি পড়ার সুযোগ না পায়
হৃদয়বৃত্তি, বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ
ঠিকমত কখনোই আর সম্ভব নয়।
কচি,কচি শিশুরাই
দেশের আসল রত্ন
তাদেরকে ঠিকমত তৈরি
করতে না পারলে
বিফল হবে আমাদের সব স্বপ্ন।
শিশুদের নিয়ে উন্নত দেশগুলি
আজ হয়েছে কত সচেতন
প্রাচীন কালে বিশ্বকে পথ দেখানো
ভারতবর্ষ আজ কেন অবচেতন?
কী করে হবে তাহলে দেশের উন্নয়ন?
রথযাত্রা - অভিজিৎ দত্ত
রথযাত্রায় মানুষ ব্যস্ত
হুজুগে আর মাতামাতিতে
ভুলে যায়,এর ভেতরের
আসল সত্যটাকে।
রথ হচ্ছে শরীর
বিগ্রহ হচ্ছে মন্দির
রশি হচ্ছে ইন্দ্রিয়
এদেরকে রাখো যদি নিয়ন্ত্রণে
সেটাই হবে প্রকৃত ধর্ম।
প্রকৃত ধর্মে নাই উচ্চ-নীচ
ভেদাভেদ আর কলহ
প্রকৃত ধর্ম মানবসেবা ও ভালোবাসায়
এটা কী বুঝে সবাই?
জগন্নাথদেবের রথযাত্রা
কয়জনই বা বুঝি?
হিংসা আর কলহে
অনেকেই মাতি।
প্রকৃত ধর্ম সদাচার ও ভালোবাসায়
জগন্নাথদেবের রথযাত্রা তাই বোঝায়।
এটা কবে বুঝবে সবাই?
কয়েক ফোটা বৃষ্টি দাও - অসিত পাল
জ্যৈষ্ঠের দাবদাহ খরায় জনজীবন অস্থির
একটু বৃষ্টির প্রত্যাশায় সকল জীব অধীর,
প্রচণ্ড রোধের তেজে সারা শরীর পুড়ে ছাই
ছায়ার আশ্রয় পেতে আমি গাছ তলায় যাই।
দাবদাহে প্রকৃতির ডালি চাইছে একটু বৃষ্টি,
দাবদাহে খাল-বিল শুকালে শিশুর মাছে দৃষ্টি।
কলমী লতা কাঁদছে মাঠে বিলে শালুক খোঁজে,
কলমী শাকে ক্যালসিয়াম শিশুর খাদ্য রোজে।
কচুরী সব শুকনা মাঠে কাঁদে অভাব জলে,
কচুরী সব কুঁয়োর জলে মৎস্য হুলোর তলে।
পটলে মাচা লতায় পটল মাচায় ঝিঙে দোলে,
পটলে দূর কোষ্ঠকাঠিন্য পলতা খাবে ঝোলে।
ভেন্ডি ক্ষেতে পাতা পোড়ে দুপুর রৌদ্র তাপে,
ভেন্ডি পটল কোলেস্টেরল, সুগার কমায় ধাপে।
বোরো ধানের পাকা মুখে ঝড়-বৃষ্টিতে ভয়,
বোরো ধানের ফলন বেশি কালবৈশাখতে লয়।
আম্রকুঞ্জে শীষ আমগুলি ঝোলে উচ্চ ডালে,
আম্রকুঞ্জে কালবৈশাখী পড়ে যে আম তালে।
ঝড়ের তাণ্ডব বায়ু কোণে উড়ে যায় ঘরের চাল,
ঝড়ের ভয়ে পাখপাখালি জড়িয়ে ধরে ডাল।
বৃষ্টির জলে মাটিতে রস মাঠ সবুজে ভরে,
বৃষ্টির জলে ধরা শীতল শান্তিতে ঘুম ঘরে।
গ্রীষ্মের দিনে আম-কাঁঠালে লিচু পাকে থোকায়,
গ্রীষ্মের খেজুর বৃষ্টিজলে মধুমাস রস জোগায়।
জৈষ্ঠ্য মাসে চুনোমাছে ইলিশের স্বাদ মুখে,
জৈষ্ঠ্য মাসে জামাই ষষ্ঠি শাশুড়ির মন সুখে।
দাবদাহের তপ্ত হাওয়া রসে-বশে-চাষে,
দাবদাহের ঝড় বৃষ্টিতে নতুন জীবন আসে।
মটর সাইকেলের লুকিং গ্লাসের দিকে তাকাই
অচেনা মানুষ হিসাবে পাই দেখতে নিজেকে ,
দেখেই খুব অবাক ! নিজেই অচেনা এক প্রাণী,
তৃষ্ণা মিটাতে পানকরি বিশুদ্ধ ডাবের পানি।
অবাক হই সাধারণ দিন মজুরের কথা ভেবে
কাঠ-পুড়া রোদ্দুরে কেমনে শ্রম দেয় কঠোরভাবে?
আকাশের নিচে শ্রমজীবী মানুষের উছিলায়
কয়েক ফোটা বৃষ্টি দাও হে ভগবান ! তোমার মহিমায়।
তোমার তুলনা নাই - সায়ন্তন সরকার
"পথের পাঁচালী" তোমার প্রথম খ্যাতি ,
অপুকে নিয়ে চলেছ অনেক পথ ,
"ঘরে বাইরে"তোমার যখন নাম
"হীরক রাজার দেশে" তখন তোমার বিজয় লাভ ।
"জলসাঘর" এর অন্দরে ঢুকে তুমি
দেখিয়েছ পথ, কত শাখা-প্রশাখা,
ভুবন জোড়া খ্যাতি তোমার
তুমিই "আগন্তুক" ।
"সোনার কেল্লা" রেখে গেছো
সেই হলুদে পাথরে ঢাকা।
যেখানে ভালো ছবি
সহজ ছবিও বটে ,
সেখানে সমালোচকের দায়িত্ব কম
কারণ দর্শক বিনার সাহায্যেই
সে-ভালোই পৌঁছাতে পারেন ,
কিন্তু এমন ভালো ছবিও হয়ে থাকে
যারা রসের আশা একমাত্র ;
প্রকৃত গুণ গ্রাহীরই লভ্য
সেখানে সমালোচকেরা এগিয়ে এসে
শিক্ষকের ভূমিকাটিও গ্রহণ করতে হয় ।
ঘড়ির কাঁটা যখন বারোটা ছুঁই , হঠাৎ এক শব্দ
মুখোশ পরা সে যে ভাবে করবে এসে জব্দ ।
ফেলুদা তোমার অবাক সৃষ্টি
চেয়ে আছে "চারুলতা",
বিশ্ব সেরা নায়ক তুমি
তোমার সৃষ্টি গাঁথা ,
শিখর ছুঁয়েছ হিমালয়ে
ঐ "কাঞ্চনজঙ্ঘা"য়
জন্ম নিয়ে গরবিনী আমি
তোমার এই বাংলায় ।।
