গল্প-জীবন তরী-মনোজ কুমার রায়

জীবন তরী

মনোজ কুমার রায়

           ময়টা ছিল বর্ষাকাল। ঘনঘটা মেঘের টুকরো গুলো আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অঝোরে বৃষ্টি নেমে। সেই সাতসকালে বেরোয় নয়ন তার তরী নিয়ে। তখন ও রবির আলো ফুটে উঠেনি।নয়ন পেশায় ছিল মৎস্যজীবী। শৈশবের হাত ধরে একটু বড় হতে না হতেই কৈশোরে তার উপর পরিবারের দায়িত্ব আসে।তার কারণ হল নয়ন অতি অল্প বয়সে পিতা মাতাকে হারায়। জীবন সংগ্রামের পথ ধরে সে মৎস্যজীবী হতে পছন্দ করে। নয়নের প্রতিবেশী ছাড়া আর কেউ নেই। একদিন সাতসকালে একা নদীতে মাছ ধরার সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়ার সময় দূর থেকে কিছু একটা স্রোতে ভেসে আসছে বলে অনুমান করে। কাছাকাছি ভেসে আসা বস্তুটি যে অন্য কিছু নয়।এটা একটা কিশোর নয়তো কিশোরী হতে পারে। নয়ন আর বিলম্ব না করে তার তরী থেকে লাফিয়ে পড়ে। তারপর স্রোতের বিপরীতে গিয়ে সাঁতার কেটে কোনরকমে তার তরীতে টেনে তুলে।নয়ন সঙ্গে সঙ্গে তার তরী বেয়ে ডাঙ্গায় তুলে আনে। নয়ন চিৎকার চেঁচামেচি করায় প্রতিবেশী জড় হয়।সবাই মিলে স্রোতে ভেসে আসা কিশোরী কে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসক জল স্রোতে ভেসে আসা কিশোরীকে ইঞ্জেকশনের সাথে পেটে চাপা দিয়ে সমস্ত জল বের করে দেন।

গল্প-জীবন তরী-মনোজ কুমার রায়


        নয়নের সেদিন আর মাছ শিকার হল না।এই কিশোরী টিকে নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত। চিকিৎসক নয়নকে ডেকে বললেন,"তোমার বোন সম্পূর্ণরূপে সুস্থ। এখন ওর কোন বিপদ নেই।ইত্যবসরে তার পাড়ার উপস্থিত সবাই বলল যে নয়ন তুমি বড্ড ভাগ্যিস।তোর কাছে যে কোথা থেকে আকস্মিক এক লক্ষী এসেছে।তোর সব মনের বাসনা এখন থেকে পূরণ হবে। নয়ন মনে মনে খুব খুশী হল। হঠাৎ নয়নের কিশোরী মেয়েটির দিকে চোখ যায়। মেয়েটি নয়নের চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নয়ন মাটিতে কিছুক্ষণ বসে। তারপর কিশোরী মেয়েটিকে নয়ন জিজ্ঞেস করে,"তোমার নাম কি?"সে নয়নের প্রশ্নোত্তরে বলে,"আমি জানি না।"নয়ন হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। ঠিক আছে, এখন আমার সঙ্গে তুমি আমার বাড়ীতে থাকবে। প্রথমে একটু অসম্মতি দেখালে ও পরে রাজি হয়ে নয়নের পিছু পিছু যেতে থাকে।যাওয়ার সময় নয়ন ভাবছে এই মেয়েটি বন্যার জলের তোড়ে কোথা থেকে আসছে তা শুধু ঈশ্বর জানেন।যাই হোক আমার সঙ্গে এই কিশোরী থাক।পাড়া পড়শীর নয়নের প্রতি সবার স্নেহ মমতা অশেষ।সবাই সুখে দুঃখে নয়নের খুঁজ নেয়। এভাবেই নয়নের সঙ্গে চার পাঁচ বছর কেটে যাওয়ার পর দুজন প্রাপ্তবয়স্ক হয়। নয়ন কিশোরীটির নূতন নাম দিল নয়না দাস। এই নূতন নাম পেয়ে নয়না খুশীতে কাঁদছে। তাঁর মা বাবার কথা কোন কিছুই মনে আসছে না।

        নয়না দাস ফর্সা সুন্দরী। নয়ন থাকে খুব কাছে টেনে এনে রান্নার কাজ শিখায়।একে অপরের প্রতি এত অনুরাগ পাড়াপড়শি আর কখনও দেখিনি। একদিন তরী নিয়ে হাওর থেকে নানা রকম মাছ ধরে এনে। কয়েক কিলো মাছ পাইকারি বাজারে বিক্রি করে দেয়।আর তাদের জন্য কিছু টা মাছ রেখে প্রতিবেশীদের মধ্যে নয়ন তা বিলিয়ে দেয়। রোজকার মত নয়ন নয়নাকে আদর করে তার তরী নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে যায়। ফিরে আসার পর স্নান টান শেষে দুজন একসাথে বসে খেয়ে নেয়।নয়না নয়নকে বলল,"আমার চুল টাকে সুন্দর করে বেঁধে দাও না।" নয়ন প্রত্যুত্তরে বলল ঠিক আছে বেঁধে দেব। তবে একটা শর্ত আছে। সেই শর্তটা কি নয়না জিজ্ঞেস করল? উত্তরে নয়ন ঐ সময় টা আসলে আমি তোমাকে বলব বলে নয়ন নয়নার চুল চিরুনী দিয়ে আঁচড়ে সুসজ্জিত একটি বেণী বেঁধে দেয়।দুজনা দুজনের প্রতি যেন আরও আকর্ষিত হয়ে উঠল।বিকেল বেলা নয়না পাড়ায় বেড়াতে গিয়ে সবাই প্রশ্ন করে," কে বেঁধে দিল রে এমন সুন্দর চুলের বিনুনি।নয়না তখন মাথা নত করে বলে,আর কে নয়ন। নয়ন কে তুই নাম ধরে ডাকিস তা ভাল নয়। সমস্ত পাড়ায় কিছুদিনের মধ্যেই নয়ন আর নয়নার প্রেমের খবর ছড়িয়ে পড়ে। নিরুপায় নয়ন পাড়া পড়শীদের সঙ্গে মত বিনিময় করে বিবাহের দিন তারিখ ঠিক করে। তারপর নয়ন আর নয়নার দাম্পত্য জীবন সুখে কাটায়। হঠাৎ একদিন নয়ন একটি সংবাদ পত্রের বিজ্ঞাপন দেখে চমকে যায়। নিখোঁজ ছবিটা যে তার নয়নার।তাই সে ভাবুক হয়ে পড়ে যদি তার হাত থেকে ফের নয়না আবার তার বাবার বাড়িতে চলে যায়। এই সমস্ত উৎকণ্ঠা নিয়ে নয়ন একা একা দিন কাটিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে। এরপর থেকে এরকম অবাঞ্চিত ঘটনা নয়নের জীবনে ফিরে আসেনি। নয়ন নয়না চিরকাল সুখী হয়ে থাকবে এইটুকু ভাবনা নিয়ে গল্পের ইতি টানি।

লেখক পরিচিত:-

লেখকের মনোজ কুমার রায়। জন্ম একুশে ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ ইং সালে। স্থায়ী বাসিন্দা করিমগঞ্জ জেলার আসাম রাজ্যে। ছোটবেলা থেকেই কবির লেখালেখি করার শখ ছিল। শিক্ষায় তিনি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। গল্প, কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ ও উপন্যাস আদি পড়েন ও লিখেন।লিখা ছাড়া কবি গল্প গুজব ও নানা খেলার আনন্দ উপভোগ করেন।